18/11/2021
সূরা নাস এর তাফসীর ✅
💟 শানে নুযূলঃ
জনৈক ইয়া*হুদী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর জাদু করেছিল। ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাসুল (সাঃ) এর উপর জাদুর চিকিৎসার জন্য আল্লাহ সুবহানা ওয়া তায়ালা, "সূরা ফালাক এবং সূরা নাস" নাজিল করেন৷ পরবর্তীতে উনার উম্মতগন এই দুই সূরাদ্বয় পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকেন৷ সূরা ফালাকে দুনিয়াবী বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে সূরা নাসে আখেরাতের আপদ ও মুসীবত থেকে আশ্রয় প্রার্থনার প্রতি জোর দেয়া হয়েছে।
🔰আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর একবার যাদু করা হয়। এমন অবস্থা হয় যে, তাঁর মনে হতো তিনি বিবিগণের কাছে এসেছেন, অথচ তিনি আদৌ তাঁদের কাছে আসেননি। সুফ্ইয়ান বলেনঃ এ অবস্থা যাদুর চরম প্রতিক্রিয়া। বর্ণনাকারী বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জেগে উঠেন এবং বলেনঃ হে ‘আয়িশাহ! তুমি জেনে নাও যে, আমি আল্লাহর কাছে যে বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম তিনি আমাকে তা বলে দিয়েছেন। স্বপ্নে দেখি) আমার নিকট দু’জন লোক এলেন। তাদের একজন আমার মাথার কাছে এবং আরেকজন আমার পায়ের নিকট বসলেন। আমার কাছের লোকটি অন্যজনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ এ লোকটির কী অবস্থা? দ্বিতীয় লোকটি বললেনঃ একে যাদু করা হয়েছে। প্রথম জন বললেনঃ কে যাদু করেছে? দ্বিতীয় জন বললেনঃ লাবীদ ইবনু আ‘সাম। এ ইয়া*হূদীদের মিত্র যুরায়ক্ব গোত্রের একজন, সে ছিল মুনা*ফিক।
প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেনঃ কিসের মধ্যে যাদু করা হয়েছে? দ্বিতীয় ব্যক্তি উত্তর দিলেনঃ চিরুনী ও চিরুনী করার সময় উঠে যাওয়া চুলের মধ্যে। প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেনঃ সেগুলো কোথায়? উত্তরে দ্বিতীয়জন বললেনঃ পুং খেজুর গাছের জুবের মধ্যে রেখে ‘যারওয়ান’ কূপের ভিতর পাথরের নীচে রাখা আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত কূপের নিকট এসে সেগুলো বের করেন এবং বলেনঃ এইটিই সে কূপ, যা আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। এর পানি মেহদী মিশ্রিত পানির তলানীর মত, আর এ কূপের পার্শ্ববর্তী) খেজুর গাছের মাথাগুলো দেখতে) শয়*তানের মাথার ন্যায়। বর্ণনাকারী বলেনঃ সেগুলো তিনি সেখান থেকে বের করেন। ‘আয়িশাহ বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলামঃ আপনি কি এ কথা প্রকাশ করে দিবেন না? তিনি বললেনঃ আল্লাহর কসম, তিনি আমাকে আরোগ্য দান করেছেন; আর আমি মানুষকে এমন বিষয়ে প্ররোচিত করতে পছন্দ করি না, যাতে অকল্যাণ রয়েছে।
[সহিহ বুখারীঃ ৫৭৬৫, (ই-ফা) ৫২৪০]
[সহিহ মুসলিমঃ ২১৮৯, (হা-এ) ৫৫৯৬, (ই-ফা) ৫৫১৫]
অন্য বর্ণনা মতেঃ জনৈক ই*য়াহুদী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর জাদু করেছিল। ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। জিবরাঈল (আঃ) আগমন করে সংবাদ দিলেন যে, জনৈক ইয়া*হুদী জাদু করেছে এবং যে জিনিসে জাদু করা হয়েছে, তা অমুক কুপের মধ্যে আছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোক পাঠিয়ে সেই জিনিস কূপ থেকে উদ্ধার করে আনলেন। তাতে কয়েকটি গ্রন্থি ছিল। তিনি গ্ৰন্থিগুলো খুলে দেয়ার সাথে সাথে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে শয্যা ত্যাগ করেন। জিবরাঈল (আঃ) ইয়া*হুদীর নাম বলে দিয়েছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে চিনতেন। কিন্তু তিনি আজীবন এই ইয়া*হুদীকে কিছু বলেননি, এমনকি তার উপস্থিতিতে মুখমণ্ডল কোনরূপ অভিযোগের চিহ্নও প্রকাশ করেননি।
[নাসায়ী: আল-কুবরা, ৩,৫৪৩]
[মুসনাদে আহমাদ: ৪/৩৬৭]
💟 ফজিলতঃ
সূরা ফালাক এবং সূরা নাস একই সাথে একই ঘটনায় অবতীর্ণ হয়েছে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহেমাহুল্লাহ উভয় সূরার তাফসীর একত্রে লিখেছেন। তাতে বলেছেন যে, এ সূরাদ্বয়ের উপকারিতা ও কল্যাণ অপরিসীম এবং মানুষের জন্যে এ দু’টি সূরার প্রয়োজন অত্যধিক। বদনজর এবং সমস্ত দৈহিক আত্মিক অনিষ্ট দূর করায় এ সূরাদ্বয়ের কার্যকারিতা অনেক। বলতে গেলে মানুষের জন্যে শ্বাস-প্রশ্বাস, পানাহার ও পোষাক-পরিচ্ছদ যতটুকু প্রয়োজনীয়, এ সূরাদ্বয় তার চেয়ে বেশী প্রয়োজনীয়।
নির্ভরযোগ্য হাদীসসমূহে সূরা ফালাক এবং সূরা নাস উভয় সূরার অনেক ফজিলত ও বরকত বর্ণিত আছে।
🔰উকবা ইবনু আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা কি দেখনি যে, আজ রাতে আমার উপর এমন কতকগুলি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে যেমন আয়াত আর কখনো অবতীর্ণ হয়নি। তারপর তিনি কুল আউযু বিরব্বিল ফালাক” এবং "কুল আউযু বিরব্বিন না-স" সূরা দু'টি তিলাওয়াত করেন।
[সহিহ মুসলিম ৮১৪, (হা-এ) ১৭৭৬, (ই-ফা) ১৭৬৪]
🔰উকবা ইবনু আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ মানুষ যা তিলাওয়াত করে, এমন দু'টি উত্তম সূরা আমি কি তোমাকে শিক্ষা দিব না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দুটি সূরা - সূরা ফালাক ও সূরা নাস শিক্ষা দিলেন। এমন সময় নামাযের ইকামত বলা হলো এবং তিনি অগ্রসর হয়ে এ দু'টি সূরাই পড়লেন, পরে তিনি আমার নিকট দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ হে উকবা! কিরূপ মনে হলো? তুমি প্রত্যেক শয়ন ও জাগরণে এ সূরা দু'টি পাঠ করবে৷
[সুনান নাসাঈ (ইফা) ৫৪৩৬]
🔰আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জ্বিনের কুদৃষ্টি এবং মানুষের কুদৃষ্টি হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। পরে যখন সূরা ফালাক এবং সূরা নাস নাযিল হলো, তখন তিনি ঐ সূরাদ্বয় পড়া আরম্ভ করলেন এবং অন্যগুলো পরিত্যাগ করলেন।
[সুনান নাসাঈ (ইফা) ৫৪৯৩]
🔰ইবন আবিস জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ হে ইবন আবিস! যা দ্বারা লোক আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে, এদের মধ্যে যা উত্তম, তা কি আমি তোমাকে বলবো না? সে বললোঃ হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেনঃ তা হলো, কুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক এবং কুল আউযু বিরাব্বিন্নাস-এ দু’টি সূরা।
[সুনান নাসাঈ (ইফা) ৫৪৩১]
🔰আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ যখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়তেন। তখনই তিনি সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে স্বীয় শরীর মুবারক দম করতেন। এরপর যখন তাঁর অসুখ খুবই বৃদ্ধি পায়, তখন আমি তা পাঠ করে, তাঁর হাত দিয়ে তাঁর শরীর বরকতের উদ্দেশ্যে মাসেহ করে দিতাম।
[সহিহ বুখারীঃ ৫০১৬, (ই-ফা) ৪৬৪৭]
🔰"সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস" এই সূরাগুলো হতে উত্তম কোন আশ্রয় কেউ গ্রহণ করে না।
[সুনান নাসাঈ (ইফা) ৫৪২৯]
🔰আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ প্রতি রাতে নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিছানায় যাওয়ার প্রাক্কালে "সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস" পাঠ করে দু’হাত একত্র করে হাতে ফুঁক দিয়ে যতদূর সম্ভব সমস্ত শরীরে হাত বুলাতেন। মাথা ও মুখ থেকে আরম্ভ করে তাঁর দেহের সম্মুখ ভাগের উপর হাত বুলাতেন এবং তিনবার এরূপ করতেন।
[সহিহ বুখারীঃ ৫০১৭, (ই-ফা) ৪৬৪৮]
🔰সন্ধ্যায় ও সকালে তিনবার সূরা ইখলাস, সূরা নাস ও সূরা ফালাক পড়লে, যাবতীয় অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়া যায়৷
[সুনান আবু দাউদঃ ৫০৮২, (ই-ফা) ৪৯৯৬]
🔰উকবা ইবনু ‘আমির (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে প্রত্যেক সলাতের পর ‘কুল আ‘ঊযু বি-রব্বিল ফালাক্ব ও কুল আ‘ঊযু বি-রব্বিন্ নাস’ সূরাহ দুটি পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
[সুনান আবু দাউদঃ ১৫২৩]
💟 তাফসীরঃ
আল্লাহ সুবহানা ওয়া তায়ালা বলেনঃ
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلنَّاسِ
(বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি মানুষের পালনকর্তার)
مَلِكِ ٱلنَّاسِ
(মানুষের অধিপতির)
إِلَٰهِ ٱلنَّاسِ
(মানুষের মা’বুদের)
এ সূরায় মহামহিমান্বিত আল্লাহর তিনটি গুণ বিবৃত হয়েছে। অর্থাৎ এখানে রব, মালিক এবং ইলাহ এ তিনটি গুণের অধিকারী আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। আল্লাহ আমাদের রব বা পালনকর্তা, মালিক বা অধিপতি, ইলাহ বা মাবুদ সবই। সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তার মালিকানাধীন এবং সবাই তার আনুগত্য করছে। আশ্রয় প্রার্থনাকারীকে এ তিনটি গুণে গুণান্বিত মহান আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এরপর আল্লাহ সুবহানা ওয়া তায়ালা বলেনঃ
مِن شَرِّ ٱلْوَسْوَاسِ ٱلْخَنَّاسِ
(তার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রণা দেয় ও আত্নগোপন করে)
সাঈদ ইবন যুবাইর (রহঃ), ইবন আব্বাস (রাঃ) এ আয়াত সম্পর্কে বলেন যে, শাই*তান আদম সন্তানের মনে তার থাবা বসিয়ে রাখে। মানুষ যখনই অন্য মনস্ক থাকে কিংবা বেখেয়াল থাকে তখনই শাই*তান কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। আর যখনই মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে তখন সে পশ্চাদপসরণ করে। (তাবারী ২৪/৭০৯) মুজাহিদ (রহঃ) এবং কাতাদাহও (রহঃ) অনুরূপ মন্তব্য করেছেন। (তাবারী ২৪/৭১০)
সুখ-শান্তি এবং দুঃখ কষ্টের সময় এবং অতি সুখের সময়েও শাই*তান মানুষের মনে ছিদ্র করতে চায়। অর্থাৎ তাকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে। এ সময়ে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে তাহলে শাই*তান পালিয়ে যায়। (তাবারী ২৪/৭১০)
ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শাই*তানকে মানুষ যেখানে প্রশ্রয় দেয় সেখানে সে মানুষকে অন্যায় অপকর্ম শিক্ষা দেয়, তারপর কেটে পড়ে। (তাবারী ২৪/৭১০)
এরপর আল্লাহ সুবহানা ওয়া তায়ালা বলেনঃ
ٱلَّذِى يُوَسْوِسُ فِى صُدُورِ ٱلنَّاسِ
(যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে)
এখানে কুমন্ত্রণাদাতা বলতে মানুষের সাথে নিয়োগকৃত শয়*তানের কথা বলা হয়েছে, যে সঙ্গী তাকে খারাপ কাজ করাতে চেষ্টার ত্রুটি রাখে না।
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকের সাথেই একজন শয়*তান সঙ্গী নিয়োগ করা হয়েছে। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনার সাথেও? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তবে আল্লাহ আমাকে তার উপর নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করেছেন ফলে তার থেকে আমি নিরাপদ হয়েছি এবং সে আমাকে শুধুমাত্র ভাল কাজের কথাই বলে।”
[মুসলিমঃ ২৮১৪, (হা-এ) ৭০০১, (ই-ফা) ৬৮৪৮]
সহীহ মুসলিমে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইতিকাফে থাকা অবস্থায় উম্মুল মু'মিনীন সাফিয়া (রাঃ) তাঁর সাথে রাতের বেলায় দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে যাবার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাঁকে এগিয়ে দেয়ার জন্য তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকেন। পথে দু’জন আনসারীর সাথে দেখা হল। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তাঁর স্ত্রীকে দেখে দ্রুতগতিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে থামালেন এবং বললেনঃ জেনে রেখ যে, আমার সাথে যে মহিলাটি রয়েছেন তিনি আমার স্ত্রী সাফিয়া বিনতে হুইয়াই (রাঃ)।” তখন আনসারী দু’জন বললেন : “আল্লাহ পবিত্র। হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এ কথা আমাদেরকে বলার প্রয়োজনই বা কি ছিল?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেনঃ ‘মানুষের রক্ত প্রবাহের মত শাইতান ঘুরাফিরা করে থাকে। সুতরাং আমি আশংকা করছিলাম যে, শাইতান তোমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দিতে পারে।
[মুসলিমঃ ২১৭৫, (হা-এ) ৫৫৭২, (ই-ফা) ৫৪৯২]
এরপর আল্লাহ বলেনঃ
مِنَ ٱلْجِنَّةِ وَٱلنَّاسِ
(জিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে)।
নাস' শব্দের অর্থ মানুষ। তবে এর অর্থ জিনও হতে পারে। মোট কথা, শাইতান জিন মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে।
অর্থাৎ এরা কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে, তা সে জিন হোক অথবা মানুষ হোক। এর তাফসীর এরূপও করা হয়েছে। মানব ও দানব শাইতানরা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন ?
وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِىٍّ عَدُوًّا شَيَٰطِينَ ٱلْإِنسِ وَٱلْجِنِّ يُوحِى بَعْضُهُمْ إِلَىٰ بَعْضٍ زُخْرُفَ ٱلْقَوْلِ غُرُورًاۚ وَلَوْ شَآءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوهُۖ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ
এমনিভাবে আমি প্রত্যেক নবীর জন্যে শত্রু করেছি শয়তান, মানব ও জিনকে। তারা ধোঁকা দেয়ার জন্যে একে অপরকে কারুকার্যখচিত কথাবার্তা শিক্ষা দেয়। যদি আপনার পালনকর্তা চাইতেন, তবে তারা এ কাজ করত না।
(সূরা আন'আম, আয়াত ১১২)
মুসনাদ আহমাদে ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললঃ “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাদের কারো মনের মধ্যে এমন কিছু উদয় হয় যা মুখে ব্যাক্ত করার চেয়ে সে জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়াকে উত্তম মনে করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেনঃ ‘(তুমি বলবে)।
الله أكبر الله أكبر الحمد لله الذي رد كيده الى الوسوسة
‘আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আল্লাহ তা'আলার জন্যই সমস্ত প্রশংসা যিনি শাইতানের প্রতারণাকে ওয়াসওয়াসা অর্থাৎ শুধু কুমন্ত্রণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, বাস্তবে কাজে পরিণত করেননি।' (আহমাদ ১/২৩৫, আবু দাউদঃ ৫১১২)
[তাফসীর ইবনে কাসির এবং তাফসীরে জাকারিয়া থেকে সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে]
সূরা নাস এর তাফসীর ✅
💟 শানে নুযূলঃ
জনৈক ইয়া*হুদী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর জাদু করেছিল। ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাসুল (সাঃ) এর উপর জাদুর চিকিৎসার জন্য আল্লাহ সুবহানা ওয়া তায়ালা, "সূরা ফালাক এবং সূরা নাস" নাজিল করেন৷ পরবর্তীতে উনার উম্মতগন এই দুই সূরাদ্বয় পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকেন৷ সূরা ফালাকে দুনিয়াবী বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে সূরা নাসে আখেরাতের আপদ ও মুসীবত থেকে আশ্রয় প্রার্থনার প্রতি জোর দেয়া হয়েছে।
🔰আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর একবার যাদু করা হয়। এমন অবস্থা হয় যে, তাঁর মনে হতো তিনি বিবিগণের কাছে এসেছেন, অথচ তিনি আদৌ তাঁদের কাছে আসেননি। সুফ্ইয়ান বলেনঃ এ অবস্থা যাদুর চরম প্রতিক্রিয়া। বর্ণনাকারী বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জেগে উঠেন এবং বলেনঃ হে ‘আয়িশাহ! তুমি জেনে নাও যে, আমি আল্লাহর কাছে যে বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম তিনি আমাকে তা বলে দিয়েছেন। স্বপ্নে দেখি) আমার নিকট দু’জন লোক এলেন। তাদের একজন আমার মাথার কাছে এবং আরেকজন আমার পায়ের নিকট বসলেন। আমার কাছের লোকটি অন্যজনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ এ লোকটির কী অবস্থা? দ্বিতীয় লোকটি বললেনঃ একে যাদু করা হয়েছে। প্রথম জন বললেনঃ কে যাদু করেছে? দ্বিতীয় জন বললেনঃ লাবীদ ইবনু আ‘সাম। এ ইয়া*হূদীদের মিত্র যুরায়ক্ব গোত্রের একজন, সে ছিল মুনা*ফিক।
প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেনঃ কিসের মধ্যে যাদু করা হয়েছে? দ্বিতীয় ব্যক্তি উত্তর দিলেনঃ চিরুনী ও চিরুনী করার সময় উঠে যাওয়া চুলের মধ্যে। প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেনঃ সেগুলো কোথায়? উত্তরে দ্বিতীয়জন বললেনঃ পুং খেজুর গাছের জুবের মধ্যে রেখে ‘যারওয়ান’ কূপের ভিতর পাথরের নীচে রাখা আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত কূপের নিকট এসে সেগুলো বের করেন এবং বলেনঃ এইটিই সে কূপ, যা আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। এর পানি মেহদী মিশ্রিত পানির তলানীর মত, আর এ কূপের পার্শ্ববর্তী) খেজুর গাছের মাথাগুলো দেখতে) শয়*তানের মাথার ন্যায়। বর্ণনাকারী বলেনঃ সেগুলো তিনি সেখান থেকে বের করেন। ‘আয়িশাহ বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলামঃ আপনি কি এ কথা প্রকাশ করে দিবেন না? তিনি বললেনঃ আল্লাহর কসম, তিনি আমাকে আরোগ্য দান করেছেন; আর আমি মানুষকে এমন বিষয়ে প্ররোচিত করতে পছন্দ করি না, যাতে অকল্যাণ রয়েছে।
[সহিহ বুখারীঃ ৫৭৬৫, (ই-ফা) ৫২৪০]
[সহিহ মুসলিমঃ ২১৮৯, (হা-এ) ৫৫৯৬, (ই-ফা) ৫৫১৫]
অন্য বর্ণনা মতেঃ জনৈক ই*য়াহুদী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর জাদু করেছিল। ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। জিবরাঈল (আঃ) আগমন করে সংবাদ দিলেন যে, জনৈক ইয়া*হুদী জাদু করেছে এবং যে জিনিসে জাদু করা হয়েছে, তা অমুক কুপের মধ্যে আছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোক পাঠিয়ে সেই জিনিস কূপ থেকে উদ্ধার করে আনলেন। তাতে কয়েকটি গ্রন্থি ছিল। তিনি গ্ৰন্থিগুলো খুলে দেয়ার সাথে সাথে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে শয্যা ত্যাগ করেন। জিবরাঈল (আঃ) ইয়া*হুদীর নাম বলে দিয়েছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে চিনতেন। কিন্তু তিনি আজীবন এই ইয়া*হুদীকে কিছু বলেননি, এমনকি তার উপস্থিতিতে মুখমণ্ডল কোনরূপ অভিযোগের চিহ্নও প্রকাশ করেননি।
[নাসায়ী: আল-কুবরা, ৩,৫৪৩]
[মুসনাদে আহমাদ: ৪/৩৬৭]
💟 ফজিলতঃ
সূরা ফালাক এবং সূরা নাস একই সাথে একই ঘটনায় অবতীর্ণ হয়েছে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহেমাহুল্লাহ উভয় সূরার তাফসীর একত্রে লিখেছেন। তাতে বলেছেন যে, এ সূরাদ্বয়ের উপকারিতা ও কল্যাণ অপরিসীম এবং মানুষের জন্যে এ দু’টি সূরার প্রয়োজন অত্যধিক। বদনজর এবং সমস্ত দৈহিক আত্মিক অনিষ্ট দূর করায় এ সূরাদ্বয়ের কার্যকারিতা অনেক। বলতে গেলে মানুষের জন্যে শ্বাস-প্রশ্বাস, পানাহার ও পোষাক-পরিচ্ছদ যতটুকু প্রয়োজনীয়, এ সূরাদ্বয় তার চেয়ে বেশী প্রয়োজনীয়।
নির্ভরযোগ্য হাদীসসমূহে সূরা ফালাক এবং সূরা নাস উভয় সূরার অনেক ফজিলত ও বরকত বর্ণিত আছে।
🔰উকবা ইবনু আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা কি দেখনি যে, আজ রাতে আমার উপর এমন কতকগুলি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে যেমন আয়াত আর কখনো অবতীর্ণ হয়নি। তারপর তিনি কুল আউযু বিরব্বিল ফালাক” এবং "কুল আউযু বিরব্বিন না-স" সূরা দু'টি তিলাওয়াত করেন।
[সহিহ মুসলিম ৮১৪, (হা-এ) ১৭৭৬, (ই-ফা) ১৭৬৪]
🔰উকবা ইবনু আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ মানুষ যা তিলাওয়াত করে, এমন দু'টি উত্তম সূরা আমি কি তোমাকে শিক্ষা দিব না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দুটি সূরা - সূরা ফালাক ও সূরা নাস শিক্ষা দিলেন। এমন সময় নামাযের ইকামত বলা হলো এবং তিনি অগ্রসর হয়ে এ দু'টি সূরাই পড়লেন, পরে তিনি আমার নিকট দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ হে উকবা! কিরূপ মনে হলো? তুমি প্রত্যেক শয়ন ও জাগরণে এ সূরা দু'টি পাঠ করবে৷
[সুনান নাসাঈ (ইফা) ৫৪৩৬]
🔰আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জ্বিনের কুদৃষ্টি এবং মানুষের কুদৃষ্টি হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। পরে যখন সূরা ফালাক এবং সূরা নাস নাযিল হলো, তখন তিনি ঐ সূরাদ্বয় পড়া আরম্ভ করলেন এবং অন্যগুলো পরিত্যাগ করলেন।
[সুনান নাসাঈ (ইফা) ৫৪৯৩]
🔰ইবন আবিস জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ হে ইবন আবিস! যা দ্বারা লোক আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে, এদের মধ্যে যা উত্তম, তা কি আমি তোমাকে বলবো না? সে বললোঃ হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেনঃ তা হলো, কুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক এবং কুল আউযু বিরাব্বিন্নাস-এ দু’টি সূরা।
[সুনান নাসাঈ (ইফা) ৫৪৩১]
🔰আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ যখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়তেন। তখনই তিনি সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে স্বীয় শরীর মুবারক দম করতেন। এরপর যখন তাঁর অসুখ খুবই বৃদ্ধি পায়, তখন আমি তা পাঠ করে, তাঁর হাত দিয়ে তাঁর শরীর বরকতের উদ্দেশ্যে মাসেহ করে দিতাম।
[সহিহ বুখারীঃ ৫০১৬, (ই-ফা) ৪৬৪৭]
🔰"সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস" এই সূরাগুলো হতে উত্তম কোন আশ্রয় কেউ গ্রহণ করে না।
[সুনান নাসাঈ (ইফা) ৫৪২৯]
🔰আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ প্রতি রাতে নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিছানায় যাওয়ার প্রাক্কালে "সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস" পাঠ করে দু’হাত একত্র করে হাতে ফুঁক দিয়ে যতদূর সম্ভব সমস্ত শরীরে হাত বুলাতেন। মাথা ও মুখ থেকে আরম্ভ করে তাঁর দেহের সম্মুখ ভাগের উপর হাত বুলাতেন এবং তিনবার এরূপ করতেন।
[সহিহ বুখারীঃ ৫০১৭, (ই-ফা) ৪৬৪৮]
🔰সন্ধ্যায় ও সকালে তিনবার সূরা ইখলাস, সূরা নাস ও সূরা ফালাক পড়লে, যাবতীয় অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়া যায়৷
[সুনান আবু দাউদঃ ৫০৮২, (ই-ফা) ৪৯৯৬]
🔰উকবা ইবনু ‘আমির (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে প্রত্যেক সলাতের পর ‘কুল আ‘ঊযু বি-রব্বিল ফালাক্ব ও কুল আ‘ঊযু বি-রব্বিন্ নাস’ সূরাহ দুটি পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
[সুনান আবু দাউদঃ ১৫২৩]
💟 তাফসীরঃ
আল্লাহ সুবহানা ওয়া তায়ালা বলেনঃ
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلنَّاسِ
(বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি মানুষের পালনকর্তার)
مَلِكِ ٱلنَّاسِ
(মানুষের অধিপতির)
إِلَٰهِ ٱلنَّاسِ
(মানুষের মা’বুদের)
এ সূরায় মহামহিমান্বিত আল্লাহর তিনটি গুণ বিবৃত হয়েছে। অর্থাৎ এখানে রব, মালিক এবং ইলাহ এ তিনটি গুণের অধিকারী আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। আল্লাহ আমাদের রব বা পালনকর্তা, মালিক বা অধিপতি, ইলাহ বা মাবুদ সবই। সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তার মালিকানাধীন এবং সবাই তার আনুগত্য করছে। আশ্রয় প্রার্থনাকারীকে এ তিনটি গুণে গুণান্বিত মহান আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এরপর আল্লাহ সুবহানা ওয়া তায়ালা বলেনঃ
مِن شَرِّ ٱلْوَسْوَاسِ ٱلْخَنَّاسِ
(তার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রণা দেয় ও আত্নগোপন করে)
সাঈদ ইবন যুবাইর (রহঃ), ইবন আব্বাস (রাঃ) এ আয়াত সম্পর্কে বলেন যে, শাই*তান আদম সন্তানের মনে তার থাবা বসিয়ে রাখে। মানুষ যখনই অন্য মনস্ক থাকে কিংবা বেখেয়াল থাকে তখনই শাই*তান কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। আর যখনই মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে তখন সে পশ্চাদপসরণ করে। (তাবারী ২৪/৭০৯) মুজাহিদ (রহঃ) এবং কাতাদাহও (রহঃ) অনুরূপ মন্তব্য করেছেন। (তাবারী ২৪/৭১০)
সুখ-শান্তি এবং দুঃখ কষ্টের সময় এবং অতি সুখের সময়েও শাই*তান মানুষের মনে ছিদ্র করতে চায়। অর্থাৎ তাকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে। এ সময়ে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে তাহলে শাই*তান পালিয়ে যায়। (তাবারী ২৪/৭১০)
ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শাই*তানকে মানুষ যেখানে প্রশ্রয় দেয় সেখানে সে মানুষকে অন্যায় অপকর্ম শিক্ষা দেয়, তারপর কেটে পড়ে। (তাবারী ২৪/৭১০)
এরপর আল্লাহ সুবহানা ওয়া তায়ালা বলেনঃ
ٱلَّذِى يُوَسْوِسُ فِى صُدُورِ ٱلنَّاسِ
(যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে)
এখানে কুমন্ত্রণাদাতা বলতে মানুষের সাথে নিয়োগকৃত শয়*তানের কথা বলা হয়েছে, যে সঙ্গী তাকে খারাপ কাজ করাতে চেষ্টার ত্রুটি রাখে না।
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকের সাথেই একজন শয়*তান সঙ্গী নিয়োগ করা হয়েছে। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনার সাথেও? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তবে আল্লাহ আমাকে তার উপর নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করেছেন ফলে তার থেকে আমি নিরাপদ হয়েছি এবং সে আমাকে শুধুমাত্র ভাল কাজের কথাই বলে।”
[মুসলিমঃ ২৮১৪, (হা-এ) ৭০০১, (ই-ফা) ৬৮৪৮]
সহীহ মুসলিমে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইতিকাফে থাকা অবস্থায় উম্মুল মু'মিনীন সাফিয়া (রাঃ) তাঁর সাথে রাতের বেলায় দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে যাবার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাঁকে এগিয়ে দেয়ার জন্য তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকেন। পথে দু’জন আনসারীর সাথে দেখা হল। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তাঁর স্ত্রীকে দেখে দ্রুতগতিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে থামালেন এবং বললেনঃ জেনে রেখ যে, আমার সাথে যে মহিলাটি রয়েছেন তিনি আমার স্ত্রী সাফিয়া বিনতে হুইয়াই (রাঃ)।” তখন আনসারী দু’জন বললেন : “আল্লাহ পবিত্র। হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এ কথা আমাদেরকে বলার প্রয়োজনই বা কি ছিল?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেনঃ ‘মানুষের রক্ত প্রবাহের মত শাইতান ঘুরাফিরা করে থাকে। সুতরাং আমি আশংকা করছিলাম যে, শাইতান তোমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দিতে পারে।
[মুসলিমঃ ২১৭৫, (হা-এ) ৫৫৭২, (ই-ফা) ৫৪৯২]
এরপর আল্লাহ বলেনঃ
مِنَ ٱلْجِنَّةِ وَٱلنَّاسِ
(জিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে)।
নাস' শব্দের অর্থ মানুষ। তবে এর অর্থ জিনও হতে পারে। মোট কথা, শাইতান জিন মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে।
অর্থাৎ এরা কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে, তা সে জিন হোক অথবা মানুষ হোক। এর তাফসীর এরূপও করা হয়েছে। মানব ও দানব শাইতানরা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন ?
وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِىٍّ عَدُوًّا شَيَٰطِينَ ٱلْإِنسِ وَٱلْجِنِّ يُوحِى بَعْضُهُمْ إِلَىٰ بَعْضٍ زُخْرُفَ ٱلْقَوْلِ غُرُورًاۚ وَلَوْ شَآءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوهُۖ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ
এমনিভাবে আমি প্রত্যেক নবীর জন্যে শত্রু করেছি শয়তান, মানব ও জিনকে। তারা ধোঁকা দেয়ার জন্যে একে অপরকে কারুকার্যখচিত কথাবার্তা শিক্ষা দেয়। যদি আপনার পালনকর্তা চাইতেন, তবে তারা এ কাজ করত না।
(সূরা আন'আম, আয়াত ১১২)
মুসনাদ আহমাদে ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললঃ “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাদের কারো মনের মধ্যে এমন কিছু উদয় হয় যা মুখে ব্যাক্ত করার চেয়ে সে জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়াকে উত্তম মনে করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেনঃ ‘(তুমি বলবে)।
الله أكبر الله أكبر الحمد لله الذي رد كيده الى الوسوسة
‘আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আল্লাহ তা'আলার জন্যই সমস্ত প্রশংসা যিনি শাইতানের প্রতারণাকে ওয়াসওয়াসা অর্থাৎ শুধু কুমন্ত্রণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, বাস্তবে কাজে পরিণত করেননি।' (আহমাদ ১/২৩৫, আবু দাউদঃ ৫১১২)
[তাফসীর ইবনে কাসির এবং তাফসীরে জাকারিয়া থেকে সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে]
সূরা নাস এর তাফসীর ✅
💟 শানে নুযূলঃ
জনৈক ইয়া*হুদী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর জাদু করেছিল। ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাসুল (সাঃ) এর উপর জাদুর চিকিৎসার জন্য আল্লাহ সুবহানা ওয়া তায়ালা, "সূরা ফালাক এবং সূরা নাস" নাজিল করেন৷ পরবর্তীতে উনার উম্মতগন এই দুই সূরাদ্বয় পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকেন৷ সূরা ফালাকে দুনিয়াবী বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে সূরা নাসে আখেরাতের আপদ ও মুসীবত থেকে আশ্রয় প্রার্থনার প্রতি জোর দেয়া হয়েছে।
🔰আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর একবার যাদু করা হয়। এমন অবস্থা হয় যে, তাঁর মনে হতো তিনি বিবিগণের কাছে এসেছেন, অথচ তিনি আদৌ তাঁদের কাছে আসেননি। সুফ্ইয়ান বলেনঃ এ অবস্থা যাদুর চরম প্রতিক্রিয়া। বর্ণনাকারী বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জেগে উঠেন এবং বলেনঃ হে ‘আয়িশাহ! তুমি জেনে নাও যে, আমি আল্লাহর কাছে যে বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম তিনি আমাকে তা বলে দিয়েছেন। স্বপ্নে দেখি) আমার নিকট দু’জন লোক এলেন। তাদের একজন আমার মাথার কাছে এবং আরেকজন আমার পায়ের নিকট বসলেন। আমার কাছের লোকটি অন্যজনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ এ লোকটির কী অবস্থা? দ্বিতীয় লোকটি বললেনঃ একে যাদু করা হয়েছে। প্রথম জন বললেনঃ কে যাদু করেছে? দ্বিতীয় জন বললেনঃ লাবীদ ইবনু আ‘সাম। এ ইয়া*হূদীদের মিত্র যুরায়ক্ব গোত্রের একজন, সে ছিল মুনা*ফিক।
প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেনঃ কিসের মধ্যে যাদু করা হয়েছে? দ্বিতীয় ব্যক্তি উত্তর দিলেনঃ চিরুনী ও চিরুনী করার সময় উঠে যাওয়া চুলের মধ্যে। প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেনঃ সেগুলো কোথায়? উত্তরে দ্বিতীয়জন বললেনঃ পুং খেজুর গাছের জুবের মধ্যে রেখে ‘যারওয়ান’ কূপের ভিতর পাথরের নীচে রাখা আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত কূপের নিকট এসে সেগুলো বের করেন এবং বলেনঃ এইটিই সে কূপ, যা আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। এর পানি মেহদী মিশ্রিত পানির তলানীর মত, আর এ কূপের পার্শ্ববর্তী) খেজুর গাছের মাথাগুলো দেখতে) শয়*তানের মাথার ন্যায়। বর্ণনাকারী বলেনঃ সেগুলো তিনি সেখান থেকে বের করেন। ‘আয়িশাহ বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলামঃ আপনি কি এ কথা প্রকাশ করে দিবেন না? তিনি বললেনঃ আল্লাহর কসম, তিনি আমাকে আরোগ্য দান করেছেন; আর আমি মানুষকে এমন বিষয়ে প্ররোচিত করতে পছন্দ করি না, যাতে অকল্যাণ রয়েছে।
[সহিহ বুখারীঃ ৫৭৬৫, (ই-ফা) ৫২৪০]
[সহিহ মুসলিমঃ ২১৮৯, (হা-এ) ৫৫৯৬, (ই-ফা) ৫৫১৫]
অন্য বর্ণনা মতেঃ জনৈক ই*য়াহুদী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর জাদু করেছিল। ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। জিবরাঈল (আঃ) আগমন করে সংবাদ দিলেন যে, জনৈক ইয়া*হুদী জাদু করেছে এবং যে জিনিসে জাদু করা হয়েছে, তা অমুক কুপের মধ্যে আছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোক পাঠিয়ে সেই জিনিস কূপ থেকে উদ্ধার করে আনলেন। তাতে কয়েকটি গ্রন্থি ছিল। তিনি গ্ৰন্থিগুলো খুলে দেয়ার সাথে সাথে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে শয্যা ত্যাগ করেন। জিবরাঈল (আঃ) ইয়া*হুদীর নাম বলে দিয়েছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে চিনতেন। কিন্তু তিনি আজীবন এই ইয়া*হুদীকে কিছু বলেননি, এমনকি তার উপস্থিতিতে মুখমণ্ডল কোনরূপ অভিযোগের চিহ্নও প্রকাশ করেননি।
[নাসায়ী: আল-কুবরা, ৩,৫৪৩]
[মুসনাদে আহমাদ: ৪/৩৬৭]
💟 ফজিলতঃ
সূরা ফালাক এবং সূরা নাস একই সাথে একই ঘটনায় অবতীর্ণ হয়েছে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহেমাহুল্লাহ উভয় সূরার তাফসীর একত্রে লিখেছেন। তাতে বলেছেন যে, এ সূরাদ্বয়ের উপকারিতা ও কল্যাণ অপরিসীম এবং মানুষের জন্যে এ দু’টি সূরার প্রয়োজন অত্যধিক। বদনজর এবং সমস্ত দৈহিক আত্মিক অনিষ্ট দূর করায় এ সূরাদ্বয়ের কার্যকারিতা অনেক। বলতে গেলে মানুষের জন্যে শ্বাস-প্রশ্বাস, পানাহার ও পোষাক-পরিচ্ছদ যতটুকু প্রয়োজনীয়, এ সূরাদ্বয় তার চেয়ে বেশী প্রয়োজনীয়।
নির্ভরযোগ্য হাদীসসমূহে সূরা ফালাক এবং সূরা নাস উভয় সূরার অনেক ফজিলত ও বরকত বর্ণিত আছে।
🔰উকবা ইবনু আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা কি দেখনি যে, আজ রাতে আমার উপর এমন কতকগুলি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে যেমন আয়াত আর কখনো অবতীর্ণ হয়নি। তারপর তিনি কুল আউযু বিরব্বিল ফালাক” এবং "কুল আউযু বিরব্বিন না-স" সূরা দু'টি তিলাওয়াত করেন।
[সহিহ মুসলিম ৮১৪, (হা-এ) ১৭৭৬, (ই-ফা) ১৭৬৪]
🔰উকবা ইবনু আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ মানুষ যা তিলাওয়াত করে, এমন দু'টি উত্তম সূরা আমি কি তোমাকে শিক্ষা দিব না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দুটি সূরা - সূরা ফালাক ও সূরা নাস শিক্ষা দিলেন। এমন সময় নামাযের ইকামত বলা হলো এবং তিনি অগ্রসর হয়ে এ দু'টি সূরাই পড়লেন, পরে তিনি আমার নিকট দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ হে উকবা! কিরূপ মনে হলো? তুমি প্রত্যেক শয়ন ও জাগরণে এ সূরা দু'টি পাঠ করবে৷
[সুনান নাসাঈ (ইফা) ৫৪৩৬]
🔰আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলা